সাহিত্য সাগরের ন্যায়। কখনো তাহাতে জোয়ার আসে, কখনো ভাটা। কখনো তাহা হয় তীব্র উত্তাল, কিংবা কখনো চাতক পাখির চারণভূমি। সাহিত্য কোনো সময়-কাল, জাতিভেদ, দেশ-দুয়ার মানেনা। সাহিত্যকে যে বা যাহারা নিজেদের স্তুতি বর্ণন করিবার দায়িত্ব বন্দুকের নলের মাধ্যমে অর্পণ করিয়াছে, তাহার নিষ্ঠুর-নিকৃষ্টরূপে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে এই সাহিত্যের দ্বারাই নিক্ষেপিত হইয়াছে এ যেমন সত্য, তেমনি যাহারা সাহিত্য দিয়া বিপ্লব করিয়াছে, গরীব সাধারণ লোকের ভাগ্য ফিরাইয়াছে, সন্তানহারা মাতার কপোলে হাসি ফিরাইয়াছে, তাঁহারা সাহিত্য সাম্রাজ্যের মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে কালে কালে সিংহাসনে উন্নীত হইয়াছে। ইহাই একমাত্র শাস্ত্র যাহাতে বোধহয় চিকিৎসা, দর্শন, গণিত ও সংগীত শাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত করা যায়। সাহিত্য কাহারো লাভ-লোকসান করিতে আসে নাই, কাহাকেও শত্রু-মিত্র বানাইতেও আসে নাই। বরং সাহিত্য দিয়াই নিজেকে, পরিবারকে, সমাজকে ও সমাজপতিদিগকে যাচাই করিতে পারা যায়। সত্য যদি একখানা মেল-লাইন হয়, তবে সাহিত্য তাহার উপর দিয়া শশব্দে, সগৌরবে ছুটে চলা মেল। তাই যদি সাহিত্য আপনার বিপক্ষে যায়, তবে ঝুঝিতে হইবে আপনি সত্যের লাইন হইতে দূরে চলিয়া আসিয়াছেন। সাহিত্য আপনাকে শিক্ষিত করিবার মহৎ দায়িত্ত্ব তাহার কাখে তুলিয়া লহিবে না, তবে নিছক ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র আনন্দদানের মাধ্যমে লেখকের মগজে সঞ্চিত জ্ঞান আপনার ভেতরে পাঠাইবে। এতক্ষণ সাহিত্যের বহু কথা কহিলাম। তবে বাস্তবে এসব সত্য কথা কদাচিৎ মানিয়া চলা হয়। আজকালকার দিনে মানুষ ও কিছু উচ্চপর্যায়ের শিক্ষাবিদ সাহিত্যকে দিয়াছে এ জাতির ছেলেপুলেকে শিক্ষিত করিবার দায়িত্ত্ব। তাহারা শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখের রচনাবলী ছাত্রদের গলায় বেত দ্বারা গাদাইয়া ভরে ও পরীক্ষার সময়ে আবার বেত দিয়া বমি করাইয়া তাহা বের করান। সবচেয়ে হাস্যকর ও দুঃখ করিবার ঘটনা হইতেছে মাধ্যমিক স্তরের সর্বোচ্চ শ্রেণিতে প্রমথ চৌধুরীর একখানা বক্তব্য প্রবন্ধ আকারে দেওয়া ছিলো, যাহার শিরোনাম ছিল 'বইপড়া'। প্রমথ চৌধুরী মহাশয় সেইখানে বাঙ্গালীর কাব্যামৃত্তে অরুচি ও তাহার প্রতিকার দিয়াছেন। তিনি বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থারও কঠোর সমালোচনা করিয়াছিলেন। কিন্তু আমাদের দায়িত্বশীল সরকার প্রমথ চৌধুরী র সেই রচনাই এতকাল তোতাপাখির ন্যায় গিলাইয়া আসিয়াছি। এ নিয়া লেখক সমাজ ভূরি-ভূরি প্রবন্ধ লিখিয়া ফেলিলেও লাভ নাই। সরকার আবার সেইসব প্রবন্ধ ছেলেপুলেকে গিলাইবে। আজ আমরা এমন এক অবস্থানে আসিয়া দাঁড়াইয়ছি, যেথায় হয় সাহিত্যকে মরিতে হইবেন নাহয় আমাদের ছেলেপুলেদের। সাহিত্য একটি সময়ক্রম। ইহা মানব সভ্যতার শুরু হইতে মানবের জীবনযাত্রা-আচার-মানসিক হাল আপনার মধ্যে শুষিয়া লইয়া যুগ যুগ ধরিয়া চলিয়াছে। যে জাতির সাহিত্য যত উন্নত, তাহাদের মনন ও মানসিকতা ততই উন্নত। নিজের ভেতরে উৎকৃষ্ট অংশটুকু কিভাবে ধারণ করিতে হয় তাহা ইহার নিকট হইতে নব্য ও পুরাতন লেখকদিগকের শিখিতে হইবে। ইহা অতি দুঃখজনক হইলেও সত্য যে আজকাল সাহিত্য লেখকদিগকের দ্বারা ব্যবহৃত হইতেছে কিছু মুষ্টিমেয় লোকের স্তুতি বর্ণনের জন্য, যাহা অনুচিত ও অনিষ্টকর। ইহাতে লেখক খ্যাতি ও দু' পয়সা রোজগার করিতে পারিলেও সাহিত্যকে হাতের উপরে একপ্রকার খুন করিয়া ফেলা হয়। যাহা সাহিত্যের ধর্ম নহে তাহা যদি এভাবে খুলিয়া চর্চিত হয়, তবে সাহিত্য শুষিয়া লইবার কিছুই আর পাহিবে না। শেষমেষ বাধ্য হইয়া এইসব অখাদ্য বহিয়া পরবর্তী প্রজন্মের নিকট হস্তান্তর করবে, যাহা কিনা প্রচণ্ড আত্মঘাতী হইবে। সাহিত্য লেখককে ধনী করিতে আসে নাই, নিজের লাভের দরকারে সাহিত্যকে ব্যবহার করিবার মতো নিন্দনীয় ও দুঃসাহসিক কাজ করিবেন না, তবে আস্তাকুঁড়ের ভিতরে গোয়েবলসও আপনার অবস্থান দেখিয়া নিজের অবস্থান লইয়া গর্ব করিবে; যাহা নিশ্চয়ই আপনার ভালো লাগিবে না।
Home »
» প্রবন্ধ: সাহিত্য ও ইহার উদ্দেশ্য
প্রবন্ধ: সাহিত্য ও ইহার উদ্দেশ্য
August 03, 2026
No comments







0 Comment:
Post a Comment
আপনার যৌক্তিক মতামত লিখুন...