গত কয়েকদিন ধরে আমার মেয়েটির শরীরের অবস্থা ঠিক নেই। এই বয়সে মেয়েটি আমার দুরন্ত, ছুটে বেড়ায় গাঁয়ের সবুজ আলে, নীলাকাশের নীচে। গাছে চড়ে। এই কাঠফাঁড়া রোদ্দুরের দুপুরেও উদ্দাম সাঁতার কাটে রায়েদের দীঘিতে। অন্যান্য মেয়েদের মতো আমার মেয়ে নরমমনা নয়। সেই মেয়েটি আজ কয়দিন ধরে শয্যাশায়ী। ঘরের বাহিরে যায়না, কিছু খায়না, বিছানা পর্যন্ত ছেড়ে উঠতে পারেনা। মুকুন্দ বৈদ্যের থেকে বাকিতে কয়টা বড়ি এনেছিলাম, কোনো কাজ হলো না। সময় গড়াতে থাকে, আর আমার হৃদপিন্ড চিন্তায়, ভয়ে এমনভাবে হাতুড়ি পেটাচ্ছে যেন এখনই খাঁচা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসবে। ক্রমেই অস্বস্তি আমার বাড়ছিলো। মেয়েটা জ্বরের ঘরে অস্ফুটভাবে বলে উঠলো, "মা"! যখন সমস্ত জাগতিক ঔষধ - উপায় বৃথা যায়, তখন ভগবান ব্যতীত আর কেন নেই। আমরা গরীব, দিন আনি আর দিন খাই। ঈশ্বর যদি এ অবস্থায় সাহায্য না করে তবে আমার স্ত্রীর মতো মেয়েটিকেও হয়তো বাঁচাতে পারবো না। না না! একি অশুভ কথা বলছি! ভগবানই একটা রাস্তা বের করবে। সেতো আমার স্ত্রীর জন্য চিতার রাস্তা বের করেছিলো। ছি ছি! ঈশ্বর নিয়ে এ কথা ভাবতে আছে! ইতিবাচক কিছু একটা হবে। কমলেশ কুমারের বউকে আর ছোটো মেয়েটিকে আমার মেয়েটির শিয়রে বসাইয়া দুটো আনা নিয়ে ছুটলাম মন্দির পানে। তপ্ত দুপুর, পা-পিঠ পুড়ে যায়। সেদিকে নজর দেওয়ার ভ্রুক্ষেপ আমার নেই। না থাকাই স্বাভাবিক, থাকাটা অস্বাভাবিক। মাইল খানেক দূরে মন্দিরে এসে হাজির হলাম। শেষ দুপুর। সদর দরজা আটকানো। দুটো আনা মানত করেছি, যদি মেয়েটি আমার সুস্থ হয়, না 'যদি' নয়, সুস্থ হতেই হবে। যদি ঈশ্বর এতো দয়ালু সত্ত্বেও বিনিময় চান, তবে আমি উনার মত দয়ালু না হয় বিনিময় চাইলে দোষ কোথায়? - ঠক্ ঠক্। - (হেড়ে গলায়)কে? কেরে? একটু শান্তিতে বসেছি... (খট্ করে দরজা খুলে) কেরে - তুই! তোকে না বলেছিলাম মন্দির মুখো হবি না? পোড়ামুখো। গতবার তোর বউয়ের মরা লাশ ছুয়ে মন্দির ছুয়েছিস। বড্ড ভগবানপ্রীতি দেখানো হচ্ছে? - পুরোহিত মশাই, আমি এই দূরে দাঁড়াচ্ছি। মেয়েটি খুব অসুস্থ, বৈদ্যও কিছু করতে পারলো না। বড্ড কষ্ট করে দুটো আনা এনেছি মানত করবো, একটু পুজো দিন না! - দলিতের আবার কি শখ! এই শালা, তুই কি ব্রাহ্মণের রীতি নকল করে অধর্ম করতে চাস? গেলো বছর তোর বউ মরেচে, এবার নাহয় মেয়েকেও মরতে দে। মন্দিরের সামনে ফ্যাঁচর ফ্যাঁচর করিসনে। বসেছিলাম নিত্যপূজোয়, শান্তি আর দিলি না ঠাস করে পুরোহিত মশাই আমার মুখের উপর দরজাটি বন্ধ করে দিলো। তখনো পুরোহিতের তিরস্কার কানে বারবার বাজছে। হায় ঈশ্বর, গেল জন্মে আমি কি এমন মহাপাপ করেছিলাম যে এ জন্মে তুমি আমাকে দলিত বানালে! হায় ঈশ্বর! হায়! কতক্ষণ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে পুরোহিত মশাইকে বারকয়েক করুন সুরে ডাকলাম। ভেতর হতে কোনো উত্তর এলো না। নিঃশব্দ। মৃত্যুর নিস্তব্দতা। সবাই শব্দ করতে ভুলে গিয়েছে। প্রথমবারের মতো মনে হলো ভগবান চির বোবা, তিনি শব্দ করতে পারেন না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল যায় যায়, পুরোহিত দরজা খুললো না। আশাহত হয়ে আর অপেক্ষা করলাম না। সূর্য ডোবার পূর্বেই আমাকে বাড়িতে পৌঁছুতে হবে, কি জানি তিস্তা বৌদি এখনো মেয়েটার শিয়রে আছে কিনা? মেয়েটা আমাকে রেখে এক মুহূর্ত থাকতে পারে না। বুকে ভারী ওজন নিয়ে খানিকটা হেঁটে, খানিকটা দৌঁড়ে বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছুলাম। কাছাকাছি যেতেই লোকজন দেখলাম। যত সামনে এগোচ্ছি, মানুষের ঘনত্ব একটু একটু বাড়ছে। কোনো এক অজানা বিপদের আশঙ্কায় বুকটা কেমন ধপাস ধপাস করছে। হন্তদন্ত হয়ে উঠোনঅব্ধি পৌঁছে দেখি, মেয়েটা আমার চরমভাবে কাতরাচ্ছে। আমি আর সইতে না পেরে মেয়েটাকে কোলে নিলাম। তিস্তা বৌদি বললো - "নন্দ, তুই যাওয়ার পর মেয়েটা খালি বাবা বাবা করছিলো। মাথায় একবার জল ঢেলে দিয়েছিলাম, যদি জ্বরটা কমে।"। মেয়েটাকে ঘরের ভেতর হতে বাইরে এনেছি, সিঁড়িতে পা দিতেই আমি থমকে গেলাম। কোলে বুকে জড়িয়ে নেওয়ার সময়ও মেয়েটার হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছিলাম, এখন পাচ্ছিনা! ভালো করে কয়েকমুহূর্ত খেয়াল করলাম, না - নেই! একমুহুর্তের জন্য মনে হলো মাথা হতে ভারী কোনো বস্তু ঢুকে শরীর বেয়ে পা দিয়ে মাটিসহ চলে গিয়েছে। আমার আর নিজের কেউ রইলো না। কয়েকমুহূর্তের হাবভাব দেখে সামনে থাকা কয়েকজন ঠায় আমাকে ধরলো, মেয়েটাকে আমার কোল হতে পারুলের মা তার কোলে নিয়ে ঘরের পানে ফিরে গেলো। চারিদিকে মানুষের ফিসফিসানি - দেখো, মেয়ে মরেচে তাও বাপের চোখে জল নেই। কান্না নেই, কেমন বাপ! মনে হয় এর অযত্নের কারণেই মেয়েটি মরেচে! সে রাত্তিরটা আমার উপর দিয়ে কিভাবে গিয়েছে, জানি না। সে রাত্তিরে আমি একফোঁটা কাঁদলাম না, কাদতে পারলাম না। কী পাষণ্ড আমি। আমিই আমার মেয়েকে যত্নে রাখতে পারিনি, তাই মনা আমার চলে গিয়েছে, বহুদূরে, আর অশ্রু আমাকে গোপন করে রাখতে বলেছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই চলে যেতে লাগলো। আমি, আমার মৃত মেয়ে, আর গুটিকয়েক লোক ঘরে। ভোরের আগে তারাও চলে গিয়েছে। পরদিন ভোরে নদীরপাড়ে সৎকার করতে রওয়ানা হলাম। ৪-৫ জন সঙ্গে।সৎকার না ছাই, দলিতের আবার সৎকার। আমার প্রাণপ্রিয় মেয়েটাকে নদীর চরে মুখাগ্নি করে দাফন দিলাম। মা - প্রকৃতিতেই মিশে থাক। পুরো পৃথিবীতেই ছড়িয়ে থাক। পুরো পৃথিবীই তুই। ঘন্টাখানেক বৃথা অশ্রু বিসর্জন দিয়ে যখন ফিরছিলাম, দেখি মন্দিরে ঘণ্টা বাজছে, পুজোপাঠ হচ্ছে, ফুলে-ফুলে সাজানো। সেই পুরোহিতই মন্ত্রপাঠ করতেছে। গোপাল বনিকের নাতি হয়েছে, গতরাতে। আজ তাই মন্দিরে ধুমধামে পূজো। ঢোল-সানাই, খাবারের গন্ধের ছড়াছড়ি,সব মিলিয়ে চাঁদের হাট বসেছে। চাঁদের হাট বললেও কম হবে। সেই থেকে আমি ধর্মত্যাগী। এখন আমি আর দুলে নই, আমি মানুষ। সেইদিন আমি উপলব্ধি করেছিলাম, ঈশ্বর আমারই সৃষ্টি, আমি ঈশ্বরের না।কোনো ঈশ্বর নেই, থাকলেও সে অর্থলোভী, পক্ষপাতদুষ্ট, বড়লোকের গোলাম। তাকে টাকা দিয়ে কেনা যায়। আমার কাছে আজ কারি কারি টাকা থাকলে কল্পিত ঈশ্বর মর্ত্যলোকে নেমে ওই পুরোহিত সহ আমার পায়ে প্রণাম করতো। **প্রশ্নের ছবিটি Prothom Alo হতে সংগৃহীত।
Home »
» ঞ. ঈশ্বরকে যদি গুটিকয় প্রশ্ন করার সুযোগ পেতে...
ঞ. ঈশ্বরকে যদি গুটিকয় প্রশ্ন করার সুযোগ পেতে...
August 16, 2026
No comments







0 Comment:
Post a Comment
আপনার যৌক্তিক মতামত লিখুন...