সবে আমি হাই স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে তখন। ম্যাট্রিক পাশের পরে এক লম্বা ছুটি পেয়েছিলুম। অন্য বন্ধুবান্ধবরা এদিক-সেদিক মজ-মাস্তি করতে গেলেও রক্ষণশীল চড়া পরিবারে জন্মেছি বলে কোথাও আর যেতে পারলুম না। ওপাড়ার নরেন এসে মাকে কত বোঝালো, মার সেই এক কথা - "**না"!** এর কিছুদিন পরেই আমার এক লম্বা ছুটির ইতি ঘটলো। যাক ঘরে বসে ঝিমুতে ঝিমুতে হাত-পায়ে ব্যামো ধরার পরিসংখ্যান এবার কমলো। রাতে খাবার সময় মা জানালেন আগামী পরশু শহরে যেতে হবে। সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, আমাকে নাকি শহরের কলেজে পড়ানো হবে। শুনে মুখ থেকে আমার আর ভাত সরে না। মায়ের দিকে ঢাঙ্গা ঢাঙ্গা চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাকি খাবার আর খেলুম না। না খাওয়ার কারণ জিজ্ঞেসিত হলো বৈকি, তবে আমি তা কর্ণপ্রহরে না ঢুকিয়ে আমার কামরায় চলে আসলুম। সত্য বলতে, আমি কভু শহরকে পছন্দ করিনি। গাঁয়ে যে তাজা পরিবেশ, চাঙ্গা মনন, তেজ প্রকৃতি, এসব শহরে কোথায়? যা দু'একটা আছে, তাও বড়লোকদের ছাদে। গাঁয়ের চেনা মেঠো পথ, পরিচিত বন্ধু ও পরিবেশ ছেড়ে শহরে কলেজে যে পড়তে হবে ভেবেই ভিতরে ভিতরে কষ্টের পাহাড় তৈরি হচ্ছে। এসব পাহাড় হয়তো হিমালয়ের থেকে বৃহৎ, গোলাপের থেকে কন্টক, চঞ্চুর থেকে ধারালো। এসব বৃহৎ বৃহৎ পাহাড় ভাঙতে যে কালাপাহাড়-চে-লেলিন ব্যর্থ হবেন তাতে আমার দ্বিমত নেই। রওয়ানা দেওয়ার দিন সকালে সব জিনিসপত্র মা-ই গুছিয়ে দিলেন। তার দিকে তাকিয়ে বুঝলুম তিনিও আমাকে শহরে একা যেতে দিতে চাচ্ছেন না। এও বুঝলুম এই সিদ্ধান্ত আমার বাবা আর তার বোন নিয়েছে। আগেই বলেছি, আমি রক্ষণশীল পরিবারের সন্তান। সিদ্ধান্ত এখানে একবারই নেয়া হয়, হোক ভালো কিংবা খারাপ। এসব পরিবার স্ট্যালিনের থেকেও খারাপ। বাড়ি হতে বেরোনোর সময় মনে হলো, আমার পরিচিত প্রকৃতি আমায় যেতে দিতে চাচ্ছে না। আমারও কি আর করা। কোন অলৌকিক ঘটনার অপেক্ষা করতে করতে মায়ের থেকে বিদেয় নিতে হল। অলৌকিক ঘটনা বলতে যদি আমি বলি, "দুনিয়ার প্রকৃতি এক হও!" এবং প্রকৃতি যদি সত্যি সত্যি গাছপালা, ঘাস, পাট দিয়ে আমায় বেঁধে রাখতো, যেতে দিত না! হায়। এসব অলীক কল্পনা আপাতত থাক। কেননা এমন কভু হয়েছে কিনা তা অজ্ঞেয়। বিকেলের একটু আগে আমরা শহরের উপকণ্ঠে এসে পৌঁছুলুম। ভ্রমণটা রেলে। জানালার দিকে তাকিয়ে কত করুণ চিন্তা ভাবনা করেছি, তার নাইবা বললুম। আমার সাথে ছিল বাবা, ভাড়া করা বাসায় আমাকে উঠিয়ে তিনি আবার গাঁয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। কিছু লাগবে কিনা, বা কোন সমস্যা আছে কিনা; সেসব কিছুই জিজ্ঞাসিত হলো না। অগত্যা আমি দরজা লাগিয়ে বিছানায় বসে ভাবতে লাগলুম, এমন পরিবারে কেন জন্ম আমার? কেন আমি বারবার আরেকজনের সিদ্ধান্ত মেনে নিই? সেদিন রাতে আমি দৃঢ় কর্কশ স্বরে কি বলতে পারতুম না যে , "আমি টাউনে যাবো না"। এসবের কোন উত্তর পেলুম না। আর শাক্যমুনির ন্যায় না চিন্তে সেদিন আমি অনেক পরিশ্রমে নিদ্রাচেষ্টায় সফল হলুম। পরদিন বাসা হতে বেরিয়ে একটু সামনে দেখবার ইচ্ছে হলো। ছোটবেলায় ৬ বছর শহরে ছিলুম বলে শহরের লৌহকড়া অলিখিত নিয়মকানুন প্রায় সবই জানতুম। সেই অলিখিত নিয়ম কারণ সন্তর্পনে মগজে ভরে বেরুলুম। দু'মিনিটের পথ হাঁটতেই একটি পাবলিক লাইব্রেরির সন্ধান পেলুম। বলে রাখি যে, আমি ছোট হতেই নানা বই পড়তুম। বেশিরভাগ বই থাকতো বিজ্ঞান, গল্প, কল্পবিজ্ঞান ইত্যাদি। ইট পাথরের শহরে এত বড় একখানা গ্রন্থাগার পেয়ে গাঁ ছেড়ে আসার দুঃখ ও গ্রন্থাগার পাওয়ার আনন্দ মাপতে লাগলুম। যদিও গাঁ ছেড়ে আসার দুঃখটা বেশিই খোঁচা দিচ্ছিল। আবার সে সব ক্ষতকে আনন্দ প্রতিষেধকও দিচ্ছিল বৈকি। পরের কয়েকমাস ভালই কাটলো। কলেজে গোটাকতক বন্ধুও জুটে গেল। সারাদিন ক্লাস শেষে আড্ডা মেরে বাসায় ফিরতুম। পরেরদিন আবারো কলেজে। এমন ভুলোচরে ফেঁসে আমি ভুলেই গেছিলুম লাইব্রেরীর কথা। একদিন সময় করে সেখানে যাওয়ার চিন্তা করলুম। পরদিন ছিল রবিবার। আমি জানতুম যে শুক্র ও শনিবার লাইব্রেরী বন্ধ থাকবে। শেষমেষ পরদিন উপস্থিত হলুম লাইব্রেরীর সামনে। "কলেজ ফাঁকি দিয়ে লাইব্রেরীতে এসেছি খবরটা গাঁয়ে গেলে আমার অবস্থা দফারফা" ভেবে চুপিসারে লাইব্রেরির এক অন্ধকার কোনায় একটি বই নিয়ে বসে যাই, আহা! কি যে সুখ। প্রথম দিনেই লাইব্রেরীতে এতশত বই দেখে আমি স্তম্ভিত। ইচ্ছে করছিল সবগুলো বই যদি আজকেই পড়ে ফেলতুম, তবে বেশ হতো। এতশত বই দেখে মনে হল, এতদিন যে দু'চারটে বই পঠেচি তাতে প্রাণ উপবাসী ছিল। আজ বোধহয় মনোবাসনা পুরিলো। পরে দেখলুম , এখানে সাহিত্য,দর্শন,ধর্ম, ইতিহাস, রাজনীতি , বিজ্ঞান পত্র-পত্রিকা, কি নেই? তবে সব বাঁধা আছে যে কালির কারাগারে। সেখান থেকে তাদের মুক্ত করে আত্মার জ্ঞানদানিতে যুক্ত করার দায়িত্ব আমার। প্রথম দিনেই আমি ছয় খানা বই পড়ে নিয়েছিলুম। গল্প। এভাবে সপ্তাহে প্রায় তিন চারদিন নিয়মিত কলেজ ফাঁকি দিতে লাগলুম। যেদিন বাধ্য হয়ে যেতুম সেদিন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই দিন কেটে যেত। ফলাফলস্বরূপ পরের পরীক্ষায় সবশেষে নাম এলো আমার। কোন মতে একটু পাস করেছি বটে তবে তা বেশ সুবিধার না। তবে সেসব দিকে তেমন মাথা ঘাটলুম না। এরকম আরো ৪-৫ মাস কাটলো। কলেজ ফাঁকি নিয়মিত চলছিল, অন্যদিকে লাইব্রেরীতে সারাদিন আমি নিজের আত্মাকে শুদ্ধ করছিলুম। সকালে বাসা হতে বেরিয়ে টং পাড়া ও জ্যাম পেরিয়ে লাইব্রেরী। সারাদিন পড়ে বিকেলে ফেরা। হাঁটার সময় আমি প্রায় প্রতিটি জিনিসই খেয়াল করতুম। দেখতে একদিন দেখি লাইব্রেরীর সামনে এক পাগলি। কিম্ভুতকিমাকার চেহারা, হাতে গলায় শখানেক তাবিজ, জট পাকানো চুল। পরনে ময়লা কাপড়। সাথে একটি বাচ্চা ছেলে। সবে হাঁটতে শিখেছে। বয়সটা ঠিক অনুমিত হলো মা। সারাদিনই লাইব্রেরির বাইরের দিকে সিড়ির উপর থাকতো। মাঝে মাঝে গ্রন্থাগারিক তাকে তাড়িয়ে দিলেও খানিক পরে আবারো আসত মাঝে মাঝেই আমি টংয়ের দোকান হতে দু'চারটে শুষ্ক রুটি এনে দিতুম। নিতে চাইতো না বৈকি, তবে আমি রেখে আসতুম। পাগলির এই আচরণ দেখে আমি মাঝে মাঝে আশ্চর্য ও বিরক্ত,দুই হতুম। কেননা অন্যান্য পাগলদের সাধারণত কিছু দিলে নিয়ে নেয়। কিন্তু কেউ দেয় না। অথচ আমি দিচ্ছি, কিন্তু পাগলী নিচ্ছিল না। আমি আমার রিক্সাভাড়া দিয়ে একে রুটি দিচ্ছি, তাও নিত না। কি আশ্চজ্জ! কয়েকহপ্তা পরে শুনি লাইব্রেরির পাশে টং দোকানে(যেখান হতে রুটি কিনতুম) নাকি আমায় নিয়ে খিল্লি ও নানা আজেবাজে মন্তব্য করা হয়। শুনে আমার মুখ পন্ডুরাঙা হলেও বেশী আর মাথায় নিলুম না। বরং এতে আমার আগ্রহ আরো বহুগুণে বেড়ে গেলো। এরপর হতে মসজিদের জেলাবী - শিরেণী, মন্দিরে পুজোর প্রসাদ, অন্য কোনো অনুষ্ঠানের খাবার, যখন যা পারতুম, এনে দিতুম। একবার মোল্লাসাব আমাকে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন যেন আমি মসজিদের পবিত্র তবারক ওই অপবিত্র পাগলী-মাকে না দেই। আমি প্রতিত্ত্যুরে শুধু একগাল গেছে বলি, "হুজুর বুখারী, হাদীস নং ১২ পড়ে নিবেন"। একবার পাশের মন্দির হতে প্রসাদ এনে পাগলিকে দিয়েছি শুনে পুরোহিত মশায় বড় ক্ষেপেছিলেন। কেননা আমি প্রসাদ পাগলিকে দিয়ে নাকি প্রসাদের অবমাননা করেছি, সন্মান নিচু করেছি। তার রক্তচক্ষুর আগুনে শুধু বললুম," দুঃখিত। পাগলীটা মনে হচ্ছে এমনি এমনিই সৃজিয়াচে। মহাদেবের সৃজন নয়।"। জানিনে উনি বুঝেছেন কিনা আমি কি বলতে চাচ্ছিলুম। সে যাই হোক, আমার আর তাতে কি? দেখতে দেখতে বছর দুয়েক চলে গেলো। উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি। মনে হলো, এইতো সেদিন এলুম। নতুন পরিবেশ, নতুন কলেজ, নতুন বন্ধু, নতুন এক অধ্যায়, এক নতুন পাতা। লিখতে লিখতে সে পাতাতেও সময় ইতি টানলো। ফিরেও বা কি করবো গাঁয়ে, যেতে তো সেই রক্ষণশীল ঘরেই হবে। এ দু'বছরে আমি বহুবার বাড়িতে গিয়েছিলুম, আবার ফিরেও এসেছি। আসার সময় বোচকা-বাটি নিয়ে যখন রওয়ানা হতুম, মায়ের চোখের টলমল জল আমাকে প্রায়ই থামিয়ে দিতো। বারবার মনে হতো ," থেকেই যাইনা, কলেজে গিয়ে আর কিইবা হবে?" বাড়িতে এলে মা যেভাবে আমায় আদর করতো, লক্ষ্য করতুম আমি লাইব্রেরীতে বসে; পাগলিটাও ওর ছেলেকে এমনই আদর করছে। তফাৎ শুধু এক জায়গায়, বাড়ি আর পার্কস্ট্রিট। মাঝে মাঝে বিভোর হয়ে ভাবতুম , এরচেয়ে বড় সম্পর্ক কি আর আছে? পরশু বাড়িতে যাওয়ার তারিখ ঠিক হলো। ইস্টিশন হতে রেলটিকেটের খোঁজ-খবর নিলুম। মোটামুটি ৭টার দিকেই রেল ছাড়বে। শীতকাল। কুয়াশা ঠেলে বাসা হতে ইস্টিশন পর্যন্ত যেতে হবে। পরদিন ভোরে তাজা সবজির আশায় বাইরে বেরূলে দেখলাম তাগড়াই কঠোর কুয়াশা উপেক্ষা করে কিছু মানুষ রাস্তায় জড়ো হচ্ছে। এমনিতে আমি এসব পাত্তা না দিলেও গেলুম। ভিড় হরকে একজনকে জিজ্ঞেস করলুম, ঘটনা কি?জানতে পারলুম একটা ছোট ছেলেকে নাকি ট্রাক কুয়াশায় চাপা দিয়ে চলে গেছে। আরেকটু সামনে গিয়ে আমি প্রায় হতভম্ভ। এ দেখি সেই পাগলির ছেলে! একেবারে পিষে গেছে। সে কি নৃশংস অবস্থা, সুস্থ মানুষ দেখলেও ভিরমি খেয়ে পড়বে সেটা হলফ করতে পারি। পাশে পাগলীটা হাউমাউ করে চেচাচ্ছে। বোধহয় ছেলেটি আর বেঁচে নেই, নড়ছে না। একটু পরে পুলিশ এলে পাগলী ও তার ছেলেকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে নিয়ে হয়। এত বিভীষিকাময় অবস্থা দেখেও আমি শেষ অবধি দাড়িয়ে রইলুম। লোকজন আবার যার যার কাজে চলে যাচ্ছে। কুয়াশা কেটে রবির দেখা মিললো। রশ্মি এসে টাটকা রক্তে ও পিচে পড়ে ঝলমলিয়ে উঠছে, ঠিকরে শুধু লাল আর লাল বেরোচ্ছে। লাল আর লাল!! বাসায় সাড়ে ১১নাগাদ ফিরলাম। চোখ থেকে লাল যেন যাচ্ছেই না। সিদ্ধান্ত নিলুম কালকেই ফিরবো গাঁয়ে, পরশু নয়। সেদিন রাত্রি খুবই কষ্টে কাটালুম রাতে তীব্র জ্বর ও নানান দুঃস্বপ্ন যেন পিছু ছাড়ছিলোই না। সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ ট্রেন ধরবো বলে ভেবেছিলাম। সে হিসেব করে আমি পৌনে ৭টায় বোচকা বেধে নেমে পড়ি। এবার আর ফিরবো না। লাইব্রেরী রোড পেরোনোর সময় দেখলাম লোকজন জড়ো হচ্ছে। রিক্সায় ব্যাগ রেখে আমি এগিয়ে গেলুম। দেখি, সেই পাগলীটা মরে পড়ে আছে, চোখ খোলা। মাছিরা উৎসব লাগিয়ে দিয়েছে। বেচারি ছেলে হারানোর দুঃখ সইতে না পেরে দুনিয়াত্যাগ করেছে। খোলা চোখটা মনুষ্যত্বের একধাপ অবনতির জানানই দিচ্ছে। সেদিন আমি এক নতুন শব্দের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে পরিচিত হয়েছিলুম ,"মাতৃত্ব"।







0 Comment:
Post a Comment
আপনার যৌক্তিক মতামত লিখুন...