১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয়েছিল বাঙালির বহুল প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা যেমন বাঙালির জন্য পরম আকাঙ্ক্ষিত গৌরবের প্রতীক, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। তেমনই এক ইতিহাসের নাম ভাগীরথী সাহা, যাঁর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল পিরোজপুরের রাজপথ। দিনটি ছিল ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। পিরোজপুর শহরের পিচঢালা পথে আলপনা এঁকে রেখেছিল ভাগীরথীর তাজা রক্ত।
১৯৪০ সালে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার দেবীপুর গ্রামে জন্ম ভাগীরথীর। আর্থিক সংকটের কারণে বাড়িতে অক্ষরজ্ঞান অর্জন করার বাইরে লেখাপড়ার সুযোগ পাননি তিনি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হয় তাঁর। স্বামী প্রিয়নাথ সাহা ছিলেন পিরোজপুর উপজেলার বাগমারা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় দুই ছেলে।
১৯৬৭ সালে স্বামীর মৃত্যুতে অসহায় হয়ে পড়েন ভাগীরথী। কষ্টের মধ্যেই দুই ছেলের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। একাত্তরের ৪ মে, ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক প্লাটুন রক্তপিপাসু পাকি হায়নারা পিরোজপুরের কয়েকশো নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং বাড়িঘর পুড়ে ফেলে। রাজাকার, আলবদর ও জামাত সমর্থকদের সাহায্যে বাগমারা গ্রামের সব বাড়ির মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। দুই ছেলের সাথে ভাগীরথী আবারও মহাবিপদে পড়েন।
উপায়ান্তর না পেয়ে তিনি পিরোজপুর শহরে বাসা বাড়িতে ঝিয়ের কাজ নেন। প্রতিদিন যাতায়াতের সময় তাঁর চোখে পড়ে নদীতে ভাসমান মানুষের লাশ। নদীর পাড়ে শিয়াল ও শকুনের ভক্ষণরত লাশ দেখতে দেখতে পাকিস্তানিদের প্রতি তাঁর তীব্র ক্ষোভ জন্মায়। একসময় তাঁর মনে জ্বলে ওঠে প্রতিশোধের অগ্নিশিখা।
সেসময় বাগমারাসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বাড়তে থাকে। ১৩ আগস্ট ১৯৭১ সালে সরোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা জুজখোলা গ্রামে অবস্থান নেন। পরে মতিউর রহমান সরদারের নেতৃত্বাধীন আরেকটি দল সরোয়ারদের সঙ্গে মিলিত হয়ে পাকিস্তানি ও তাদের দোসর রাজাকার কমান্ডার আবদুল আলীর উপর আক্রমণ চালায় এবং তাকে কঠোর শাস্তি দেয়।
ভাগীরথী তাঁদের কাছে যুদ্ধে অংশগ্রহণের আগ্রহ দেখান। তাঁকে দেওয়া হয় পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরদের গতিবিধির উপর নজর রাখার দায়িত্ব।
মুক্তিযোদ্ধাদের গুপ্তচর হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে ভাগীরথী পিরোজপুর শহরে এসে পাক দখলদারদের ক্যাম্পের সামনে ভিক্ষুকের ভান ধরেন। তাঁকে দেখে পাকিস্তানি সুবেদার সেলিম প্রস্তাব দেন মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান সম্পর্কে গোপনে তথ্য দেওয়ার। ভাগীরথী তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেন, তবে শুধুমাত্র তাদের বিভ্রান্ত করার জন্য। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তুত রেখে ২৯ আগস্ট বাগমারায় খানসেনাদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। ভাগীরথীর তথ্যানুযায়ী তারা সেখানে যায় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের শিকার হয়।
৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর আবারও ভাগীরথীর দেওয়া তথ্যে পাকসেনারা বাগমারা, পোরগোলা সহ আশপাশের গ্রামে যায়। তবে সেখানে পৌঁছে তাঁরা বুঝতে পারে, তাঁরা পাতানো ফাঁদে পড়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের হঠাৎ আক্রমণে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি হতাহত হয়। ফেরার পথে প্রতিশোধ হিসেবে নিরীহ মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ক্যাম্পে ফিরে ক্যাপ্টেন এজাজকে সব জানানো হলে সে নিশ্চিত হয় যে, ভাগীরথী প্রকৃতপক্ষে তাদের নয়, বরং মুক্তিযোদ্ধাদের গুপ্তচর। এরপর ভাগীরথীকে হত্যা করার নির্দেশ দেয় এজাজ।
১৩ সেপ্টেম্বর ভাগীরথী পিরোজপুর শহরে এসে পাকসেনাদের গতিবিধি ও তাদের খোঁজখবর নিতে থাকেন। তাঁর শহরে ঢোকার খবর ক্যাম্পে পৌঁছায়। রাজাকাররা তাঁকে ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় ক্যাপ্টেন এজাজের সামনে। সুবেদার সেলিমকে নির্দেশ দেওয়া হয় সবার সামনে ভাগীরথীকে হত্যা করার। দুজন সিপাহী রশি দিয়ে ভাগীরথীকে বিবস্ত্র করে তাঁর দুই হাত বাঁধে এবং তাঁকে মাটিতে ফেলে দেয়। রশির অপর প্রান্ত মোটরসাইকেলের সঙ্গে বেঁধে শহরের বিভিন্ন সড়কে তাঁকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভাগীরথী রক্তাক্ত হয়ে শহরের পিচঢালা পথে ছিটকে পড়েন এবং অবশেষে প্রাণ হারান। পরে তাঁর নিথর দেহটি বলেশ্বর নদীতে নিক্ষেপ করা হয়।
পিরোজপুরের সাংবাদিক খালিদ আবু বলেন,
“আমি স্বচক্ষে পোস্ট অফিস রোড থেকে ভাগীরথীকে টেনে নেওয়ার দৃশ্য দেখেছি। দেখেছি ভাগীরথীর রক্তাক্ত সাদা শাড়ি আর রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা রক্তের ছোপ।” পিরোজপুরের খরস্রোতা বলেশ্বরের উত্তাল ঢেউ ও তীব্র স্রোতে ভাগীরথীর নিথর দেহটি ভেসে যায়।
পিরোজপুর শহরে স্থাপিত শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে ভাগীরথীর নাম রয়েছে চতুর্থ স্থানে। আর শহরের কৃষ্ণচূড়া মোড়টিতে তাঁর নামে রয়েছে একটি ফলক। ভাগীরথীর ঠাঁই হয়নি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়। একাত্তরের শহীদ ভাগীরথী সাহা বেঁচে আছেন শুধুমাত্র পিরোজপুর শহরের একটি নামফলকের মাঝে।
[সংগৃহীত](https://www.facebook.com/share/p/1AYzhakcN7/)











