বিদ্যালয়ের বিদায় অনুষ্ঠানে আমার লেখা বক্তব্য।

স্কুলে আমাদের বিদায় অনুষ্ঠান বোধহয় ২৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে হয়েছিল। সেখানে আমাকে বক্তব্য দেয়ার জন্য বলা হয়েছিল। স্বভাবতই আমি ঘরকুনে এবং তাই রাজি হইনি। তবে সেদিন বক্তব্য দিলে যা বলতাম:- সময় একটি নদীর মত। চলে যায়, বয়ে যায়, বাঁক নেয়। আমাদের জীবনও সময়ের সঙ্গে সমান্তরালে চলে। আজ থেকে ঠিক ৫ বছর আগে আমাদের জীবনে একটি ছোট বাঁক আসে, আমরা ক্লাস ফাইভ পাস করি। এরপরে হয়তবা জসিম উদ্দীনের "সোজন বাদিয়ার ঘাট" পেরিয়ে, জীবনানন্দ দাশের "রূপসী বাংলা"র সবুজ মাঠ হেঁটে এই বিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হই। ক্লাস সিক্স, সেভেন, এইট, নাইন, টেন। দেখতে দেখতেই শেষ হয়ে যায় আরো পাঁচটি ক্লাস। এই পাঁচটি ক্লাসে যে কত খুনসুটি, স্মৃতি, আনন্দ-বেদনা, রাগ, বন্ধন, ক্ষোভ, কত যে গল্প জড়িয়ে আছে, তা লিখতে বসলে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের "মেঘনাদবধ" মহাকাব্য ছড়িয়ে যাবে। এমনকি বিশ্বকোষের কয়েক বালামেও তা সংকুলান হবে না। অন্য সময়ে বিদায় অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা বলেন, "আমাদের পিতৃতুল্য শিক্ষকগণ যা শিখিয়েছেন, তা আমরা চিরদিন মনে রাখবো"। কিন্তু আমি তা বলব না। আমি বলতে চাই, "আমাদের পিতৃতুল্য শিক্ষকগণ যা শিখিয়েছেন, তাতে আমরা তাদের নিকট চিরদিনই ঋণী। এই ঋণ শোধ করার চেষ্টা স্বরূপ এই জ্ঞান আমরা পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেবো, যেন এই জ্ঞান সর্বদা জীবিত থাকে এবং তাদের কান্ডারী হবো।" এই পাঁচ বছরের তারা আমাদের ভালোর জন্যেই শাসন করেছেন, আবার স্নেহও করেছেন। চিন্তিত হয়েছেন আমাদের ভবিষ্যত নিয়ে। হয়ত তাদের অনেক ভুল বুঝেছি, মারের ভয়ে স্কুল পালিয়েছি। কিন্তু সে বয়সে কে বুঝবে যে তারা আমাদের ভালোর জন্যই এসব করেন? আজ আমরা এসেছি সেই ব্যথিত বিদায়ের ক্ষণে, আমরা আমাদের শিক্ষকদের নিকট চিরকৃতজ্ঞ, চিরঋণী। বিদায়ের ক্ষণের কষ্ট সর্বদাই থাকে না বলা, অলিখিত। অন্যান্য শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের মত আমাদেরও হাজিরা খাতাটি হয়ত পরে রবে বিদ্যালয়ের কোনো এক কোণে। হাজিরা খাতাটি পৌঁছুবে কোনো এক ঝালমুড়িওডয়ালার কাছে। হয়ত কিছুদিন পরে সেই হাজিরা নাম থাকা মানুষগুলো দূরে দূরে চলে যাবে। বহুদিন পরে কেউ হবে বৃদ্ধ, কেউবা এই তিনমাত্রার জগৎ ছেড়ে অন্য জগতে গমন করবে। কিন্তু বৃদ্ধবয়সে, সূয্যিমামার রাজত্বের শেষ প্রহর, গোধূলি বেলায় আমরা ঠিকই আমাদের শিক্ষকদের, আমাদের বিদ্যালয় এবং সকল বন্ধুদের কথা আবারও মনে করবো। সেদিন রাতের আকাশে চশমার লেন্সের ভেতর দিয়ে আকাশে ফুলের মত ফুটে থাকা মিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র গননা করে শেষ করে ফেললেও হয়ত স্কুলের সেই দিনগুলির রূপ, স্বাদ, গন্ধ আর ফিরে পাবো না। স্কুলের কেউ আমাদের হয়তবা বহুদিন পরে আর চিনবে না। নতুন শিক্ষক, নতুন শিক্ষার্থী নিয়ে এই স্কুল নিশ্চয়ই ফুলে-ফলে আবারও ভরে উঠবে। কিন্তু স্কুলের সেই ফুলগাছটি, ভেঙ্গে যাওয়া বেঞ্চগুলো, বেতগুলো, কংক্রিটগুলো অবশ্যই আমাদের অপেক্ষায় থাকবে। আজও পেছনে ফিরলে শুনতে পাবে লাস্ট পিরিয়ডের মধুর এবং সাসপেন্সে ভরা ঘণ্টা খানি। সবার কাছ থেকে আমি দোয়া চেয়ে বক্তব্য শেষ করছি...

0 Comment:

Post a Comment

আপনার যৌক্তিক মতামত লিখুন...