প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ সম্পর্কে(১)

বিভিন্ন মহলে "প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ" এর রিভিউ ও গুণগান দেখে মনে হলো, পড়ে ফেলা যাক। পিডিএফ ডাউনলোড করে ফেললাম(গার্ডিয়ান প্রকাশনীর, আমার দেখানো পেজ নাম্বার সবার সঙ্গে মিশতে নাও পারে) প্রথম অধ্যায় পড়েই আমি হতবাক। জনাব আরিফ আজাদের সেমি-অজ্ঞেয়বাদী, সেমি-নাস্তিক বন্ধু সাজিদ নাকি না দেখলে কিছুই বিশ্বাস করেন না। সাজিদ এ কথা বলেছে, কারণ তার আগে জনাব আরিফ আজাদ বলেছেন: "সম্পর্ক আছে। স্রষ্টায় বিশ্বাসটাও এমন একটা বিষয়, যেটা আমরা, মানে মানুষেরা, আমাদের ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য প্রমাণাদি দিয়ে প্রমাণ করতে পারবো না। স্রষ্টা কোনো টেলিস্কোপে ধরা পড়েন না। উনাকে অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও খুঁজে বের করা যায়না। উনাকে জাস্ট বিশ্বাস করে নিতে হয়।" (এই কথা কার্ল সেগানের ড্রাগন গল্পের সঙ্গে মিলে যায়। একটু পরে বলতেছি) তাই সাজিদ বলছে, তিনি নাকি না দেখলে কিছুই বিশ্বাস করেন না। আমার মনে হয়, সাজিদ যদি বাস্তব কোনো মানুষ হয়, তাহলে সে নির্বোধ। আধুনিক কোনো নাস্তিক এটা বলেন না যে "আমি না দেখলে সেটা বিশ্বাস করি না"। এটা খুবই পুরোনো ও জনপ্রিয় একটি বিতর্ক, জনাব আরিফ আজাদ সাহেব এখানে স্ট্রম্যান লজিক্যাল ফ্যালাসি ব্যবহার করেছেন। যদি কেউ দাবি করে যে আমি যা দেখি না, সেটাতে বিশ্বাস করি না, তবে আধুনিক বিজ্ঞানের একটা বড় বিষয়কে তিনি বাদ দিচ্ছেন। প্রোটনকে দেখা যায় না, কিন্তু সেটা নিউক্লিয়াসের একটি মৌলিক কণা। ব্ল্যাক হোল, হিগস ফিল্ড এসব প্রথমে গাণিতিকভাবে প্রেডিক্ট করা হয়েছিল, পরে বাস্তবে আবিষ্কৃত হয়েছে না দেখেই। এক্স-রে চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ফটোগ্রাফিক প্লেট বা ফ্লুরোসেন্ট স্ক্রিনে এর অস্তিত্ব প্রমাণিত। বাতাসকে দেখা যায় না, কিন্তু অনবরত শ্বাস নিয়ে সেটার অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায়। নিজের মস্তিষ্ককে সরাসরি দেখা যায় না বলে অস্বীকার করলে, সেটা নিজেকে অস্বীকার করারই নামান্তর ও বোকামি। একটু পরে জনাব আরিফ আজাদ সাহেব আরেকটি পুরোনো তর্কে গিয়েছেন। সেখানে বলেছেন, "সাজিদ তার বাবাকে কেন বাবা বলে বিশ্বাস করে?" এইখানে আমার যুক্তিটি হলো: বাবাকে বিশ্বাস করার পেছনে বাস্তব, যাচাইযোগ্য ও বহুস্তরীয় প্রমাণ আছে। যেমন: সাজিদের মা ও সমাজ তাকে সেই ব্যক্তিকেই বাবা বলে চিহ্নিত করেছে। শৈশব থেকে সেই ব্যক্তি তাকে সেবা-যত্ন, অর্থসাহায্য ও আবেগ দিয়েছেন যা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। প্রয়োজন পড়লে ডিএনএ টেস্ট করেও নিশ্চিত হওয়া যায়। কিন্তু ঈশ্বরের ক্ষেত্রে এর কোনোটিই নেই। নেই কোনো স্বর্গীয় মা বা সমাজের ঐক্যমত, নেই কোনো প্রত্যক্ষ যত্ন বা অভিজ্ঞতা, নেই কোনো পরীক্ষার সুযোগ। তাই বাবার সাথে ঈশ্বরের তুলনা করা যৌক্তিকভাবে ভুল; এটি False analogy। সাজিদ বাবাকে বিশ্বাস করে প্রমাণ ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, আর ঠিক একই মানদণ্ডে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে না প্রমাণের অভাবে। তর্কের খাতিরে ধরেও নিলাম যে সাজিদের মা বা সমাজ ভুল লোককে বাবা বলেছে এবং সাজিদ অন্ধবিশ্বাস করছে। তাই বলে এটা প্রমাণ হয় না যে ঈশ্বর আছে। এক অন্ধবিশ্বাস আরেক অন্ধবিশ্বাসকে জাস্টিফাই করতে পারে না। অন্ধবিশ্বাসের সঙ্গে অন্ধবিশ্বাসের ডট বা ক্রস গুণ যাই করা হোক, উত্তর অন্ধবিশ্বাসই আসে। জনাব আরিফ আজাদ সাহেব এমন কেন করলেন, আমি জানি না। এখানে একটা জিনিস আরেকটু স্পষ্ট করা দরকার। বিশ্বাস(believe), আস্থা(trust), আর ঈমান-সুলভ বিশ্বাস (Faith) এই তিনটে শব্দ প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয়। অথচ এদের অর্থ আলাদা। Believe হলো কোনো একটা দাবিকে সত্য বলে ধরে নেওয়া, প্রমাণভিত্তিকও হতে পারে, প্রমাণ ছাড়াও হতে পারে। Trust হলো কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর নির্দিষ্ট আচরণের উপর নির্ভরতা যেটা সাধারণত ট্র্যাক রেকর্ড বা যাচাইযোগ্য অভিজ্ঞতার উপর দাঁড়িয়ে থাকে, যেমন: একটা ব্রিজ পার হওয়ার সময় আমি আস্থা রাখি সেটা আমার ভার বইবে কারণ আমি জানি এটা সঠিক নিয়ম মেনে বানানো আর হাজারো মানুষ প্রতিদিন এটা নিরাপদে পার হচ্ছে। আর Faith হলো এমন এক ধরনের বিশ্বাস, যেটা সংজ্ঞাগতভাবেই প্রমাণ বা পরীক্ষার ধার ধারে না, বরং প্রমাণের অনুপস্থিতিতেও অবিচল থাকাটাই যার বৈশিষ্ট্য বলে দাবি করা হয়। সাজিদ তার বাবাকে বিশ্বাস করে আসলে Trust এর ভিত্তিতে, যাচাইযোগ্য, ট্র্যাক-রেকর্ডভিত্তিক, আর জনাব আরিফ আজাদ সাহেব সেটাকে ঈশ্বরে বিশ্বাসের (Faith, যাচাই-অযোগ্য, প্রমাণ-নিরপেক্ষ) সাথে এক কাতারে ফেলে দিচ্ছেন। এই দুটো এক জিনিস নয়, বরং false analogy ৩৩ নম্বর পৃষ্ঠায় জনাব আরিফ আজাদ সাহেব সাজিদের মুখে একটা উদাহরণ দিয়েছেন, যেখানে লোকটিকে (লোকটি মূলত ভাষাবিজ্ঞানী ডক্টর হুমায়ুন আজাদ) জিজ্ঞেস করা হয় তিনি ডক্টর হুমায়ূন আজাদ রচিত "আমার অবিশ্বাস" বইয়ের কোন পৃষ্ঠায় থাকেন। আসলে সাজিদ এমন কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেছেন: মনে করুন আপনি একজন চিত্রকর, চিত্র আঁকলেন। চিত্রের ভেতরের চরিত্রগুলো জীবন্ত! এখন আপনি তাদের স্রষ্টা। তারা সেই চিত্রের ভেতরে বসে বসে যুক্তি-তর্ক করছে যে ঈশ্বর অর্থাৎ চিত্রকর আছে কি না? সাজিদ এখানে বলতে চাচ্ছেন, স্রষ্টা যেহেতু স্পেস টাইমের বাইরে থাকেন তাই আমরা তাকে প্রমাণ করতে পারবো না। যদি প্রমাণই না করতে পারি, তবে বিশ্বাস করে যেতে হবে। এটা মূলত god of the gaps ঘরানার যুক্তি, তবে আরও নির্দিষ্ট করে বললে এটা দুটো ভ্রান্তির মিশ্রণ। নিজের সত্তাকে সংজ্ঞা দিয়েই অপ্রমাণযোগ্য বানিয়ে ফেলা, আর তারপর প্রমাণের দায়টা উল্টে সন্দেহকারীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া। এছাড়াও যেহেতু উনি বললেন প্রমাণ নেই, তাই আমিও এমন বলতে পারি — "আমার বাড়িতে এক ৩০ পা ওয়ালা অদৃশ্য মাকড়সা থাকে। সে আমার সঙ্গেই সারাদিন বাড়ির ভিতরে ঘোরাফেরা করে। শুধু আমিই তার কথা শুনতে পাই, আর কেউ শুনতে পাবে না। আপনারা কেউ ওকে কোনোভাবে প্রমাণ করতে পারবেন না, তাই ওকে বিশ্বাস করুন।" অথবা "আমি দাবি করছি স্পেস টাইমের বাইরে এক ড্রাগন থাকে। আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি। কিন্তু যেহেতু সে স্পেস টাইমের বাইরে তাকে কোনোভাবেই প্রমাণ করা যাবেনা, শুধু বিশ্বাস করে নিতে হবে।" একটু ভাবুন, আমার এই দাবিটা নন্সেসের মতো লাগে না? এই দুটো উদাহরণ আসলে কার্ল সেগানের একটা বিখ্যাত গল্পের সঙ্গে যায় যেটার কথা শুরুতেই বলেছি। কার্ল তার The Demon-Haunted World বইয়ে লিখেছেন: ধরুন কেউ দাবি করল তার গ্যারেজে একটা ড্রাগন আছে যার শ্বাসে আগুন বের হয়। আপনি বললেন, দেখাযাক। লোকটা বলল, ড্রাগনটি অদৃশ্য। আপনি বললেন, মেঝেতে ময়দা ছড়িয়ে দিই, পায়ের ছাপ পড়বে। লোকটা বলল, ড্রাগনটি শূন্যে ভাসে, পা-ই মাটিতে রাখে না। আপনি বললেন, ইনফ্রারেড ক্যামেরায় আগুনের তাপটি রেকর্ড ধরা যাক। লোকটা বলল, ড্রাগনের আগুনে কোনো তাপ নেই; বিশেষ আগুন। এমনে প্রতিটা পরীক্ষার জন্য একটা একটা অজুহাত রেডি থাকে। কার্লের প্রশ্নটা ছিল যে দাবিকে কোনোভাবেই পরীক্ষা করা যায় না, প্রতিবার নতুন অজুহাত দিয়ে যাচাই এড়িয়ে যাওয়া হয়, সেই দাবি আর ড্রাগন নেই এই দুটোর মধ্যে বাস্তবে কোনো পার্থক্য থাকে কি? জনাব আরিফ আজাদ সাহেবের ডক্টর হুমায়ূন আজাদের বইয়ের ভেতরে থাকার উদাহরণেও একই কৌশল। গডকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যাতে কোনো পরীক্ষাতেই তাকে ধরা না যায়, আর সেই অধরাতাকে উল্টো বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি বানানো হয়েছে। ভালো কথা, স্পেস টাইমের বাইরে কোন জায়গা আছে? সেটার প্রমাণও বার্ডেন অব প্রুফ অনুযায়ী সাজিদ অর্থাৎ জনাব আরিফ আজাদ সাহেবের উপরেই বর্তায়। এই জায়গাতেই বার্ট্রান্ড রাসেলের বিখ্যাত টিপট উদাহরণটা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ১৯৫২ সালে "Is There a God?" নামের একটা প্রবন্ধে রাসেল বলেছিলেন: তিনি যদি দাবি করেন পৃথিবী আর মঙ্গলগ্রহের মাঝামাঝি একটা চীনামাটির টিপট উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে আর সেটা এত ছোট যে সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপেও ধরা পড়বে না তাহলে কেউ এটা মিথ্যা প্রমাণ করতে পারবে না। কিন্তু "যেহেতু আপনি এটা মিথ্যা প্রমাণ করতে পারছেন না, তাই এটা মেনে নিতেই হবে" এমন যুক্তি দিলে সেটা স্রেফ অর্থহীন কথা হয়ে দাঁড়ায়। রাসেলের মূল কথা আসলে ছিলো প্রমাণ দেওয়ার দায়িত্ব যিনি দাবি করছেন তার, যিনি সন্দেহ করছেন তার নয়। আমার ৩০ পায়ের মাকড়শা আর বার্ট্রান্ড রাসেলের টিপট দুইটাই একই নীতিতে দাঁড়িয়ে আছে। বইয়ের অনেক দূরে চলে এসেছি। পেজ ৬ এ যাই। জনাব আরিফ আজাদ সাহেব এখানে খুবই নিকৃষ্ট একটি উদাহরণ দিয়েছেন। উনি যদি এই পৃষ্ঠাটি লেখার জন্য যথেষ্ট সময় নিতেন, তবে ভালো ভাষায় একটা উদাহরণ দিতে পারতেন। উনি উদাহরণ টেনেছেন, সাজিদের গার্লফ্রেন্ডকে যদি জনাব আরিফ আজাদ সাহেব ধ+ষ+র্ণ করেন এবং সাজিদ যদি সেটা জানতে পারে, তবে সাজিদ বিজ্ঞান দিয়ে জনাব আরিফ আজাদ সাহেবের কেন শাস্তি হওয়া উচিৎ সেটি নির্ধারণ করতে পারবে কিনা? (আমাকে গালাগাল করে লাভ নেই, জনাব আরিফ আজাদ সাহেব এটি নিজে উদাহরণ টেনেছেন। আমার কথা বিশ্বাস করতে বলছি না, আমি আপনাকে বইটি খুলে পেজ সংখ্যা ৬ এ যেতে বলছি। আমি এই লেখা জনাব আরিফ আজাদকে সম্মান করেই লিখছি। আমি প্রত্যেকবার ওনাকে "জনাব আরিফ আজাদ সাহেব" বলে সম্বোধন করছি।) এখানে মূলত জনাব আরিফ আজাদ সাহেব যেটা বোঝাতে চেয়েছেন সেটা হলো, বিজ্ঞান সবসময় খাটে না। হ্যাঁ, এইখানে বিজ্ঞান শুধু অপরাধী সনাক্তকরণের জন্য কাজ করবে, কেন শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন সেটা দর্শন ও সংবিধান বলবে। উনি বলতে চাচ্ছেন বিজ্ঞান সবজায়গায় খাটে না, তাই বিশ্বাস করতে হবে। ধর্ষণের কনটেক্সটে এটাতো false dichotomy , বিজ্ঞানের একটা সীমাবদ্ধতাকে সরাসরি স্রষ্টার প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ বানিয়ে ফেলা। আর যদি বিশ্বাসের কনটেক্সটে ধরি তবে god of the gaps. এখানে false dichotomy দিয়ে একটা রাস্তাকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে: দর্শন। নৈতিকতা বোঝার জন্য শুধু বিজ্ঞান আর ধর্ম নয়, একটা তৃতীয় রাস্তাও আছে, আর মানুষ কোনো ধর্মগ্রন্থ ছাড়াই হাজার হাজার বছর ধরে এই রাস্তায় হেঁটে এসেছে। গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস শুধু প্রশ্ন করে করে বের করার চেষ্টা করতেন "ভালো" জিনিসটা আসলে কী? প্লেটো তার "ইউথিফ্রো"তে একটা প্রশ্ন তোলেন: কোনো কাজ কি ভালো, কারণ ঈশ্বর সেটাকে ভালো বলে দিয়েছেন, নাকি ঈশ্বর সেটাকে ভালো বলেছেন কারণ কাজটা এমনিতেই ভালো ছিল? (এই প্রশ্নটা এখনই আরও কাজে লাগবে।) অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, মানুষ বারবার ভালো কাজের চর্চা করেই ভালো মানুষ হয়ে ওঠে, এখানে কোনো ঐশ্বরিক নির্দেশের দরকার পড়ে না। এপিকিউরাস আর স্টয়িক দার্শনিকরাও দেখিয়েছেন, মানুষ শুধু যুক্তি আর পর্যবেক্ষণ দিয়েই একে অপরের ক্ষতি এড়িয়ে চলার আর ন্যায্য আচরণের নিয়ম বের করতে পারে আর এসব চিন্তা ইসলাম বা খ্রিস্টধর্ম প্রতিষ্ঠার বহু শতাব্দী আগের। তাই "বিজ্ঞান নৈতিকতা ব্যাখ্যা করতে পারে না, তাই স্রষ্টা লাগবে" এই সিদ্ধান্তটা একটা false dichotomy (আগেই বলেছি) কারণ তৃতীয় রাস্তা দর্শনকেই এখানে হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। আর যেহেতু স্রষ্টাকে দিয়ে নৈতিকতা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হচ্ছে, তাহলে একটা পুরনো প্রশ্ন এখানে না তুললেই নয় যেটা প্রথম তুলেছিলেন প্লেটো আর পরে বার্ট্রান্ড রাসেল তার "Why I Am Not a Christian" প্রবন্ধে। প্রশ্নটা এরকম: ধর্ষণ কি ভুল, কারণ স্রষ্টা সেটাকে নিষেধ করেছেন? অর্থাৎ ভুল-ঠিক পুরোপুরি স্রষ্টার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল? নাকি স্রষ্টা সেটাকে নিষেধ করেছেন কারণ সেটা আগে থেকেই ভুল ছিল, অর্থাৎ ভুল-ঠিক স্রষ্টার ইচ্ছা থেকে স্বাধীন একটা ব্যাপার? দুটো উত্তরই সমস্যাজনক। প্রথমটা সত্যি হলে, স্রষ্টা চাইলে ধর্ষণকেও ভালো ঘোষণা করতে পারতেন, আর নৈতিকতা তখন নিছক একটা খামখেয়ালি আদেশ হয়ে দাঁড়ায়। তখন "স্রষ্টা ভালো" বলাটাও অর্থহীন হয়ে পড়ে, কারণ ভালো-মন্দের কোনো স্বতন্ত্র মাপকাঠিই আর অবশিষ্ট থাকে না। আর দ্বিতীয়টা সত্যি হলে মানে ধর্ষণ স্বাধীনভাবেই ভুল; স্রষ্টা শুধু সেটা চিনিয়ে দিয়েছেন, তবে নৈতিকতা স্রষ্টার অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীলই নয়; তখন প্রশ্ন থেকে যায়, নৈতিকতা ব্যাখ্যা করতে স্রষ্টাকে ডাকারই বা কী দরকার? জনাব আরিফ আজাদ সাহেব পেজ ৬-এর উদাহরণে ঠিক এই দ্বিমুখী সমস্যার মধ্যেই পড়ে যান, না বুঝেই। বইয়ের আরেকটা জায়গায় জনাব আরিফ আজাদ সাহেব বলেছেন, বিজ্ঞান যেহেতু প্রতিনিয়ত বদলায়, তাই তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না, একে তিনি নেহাত একটা সাময়িক "চুক্তি" বলে খাটো করে দেখিয়েছেন, আর তার বিপরীতে ধর্মীয় বিশ্বাসকে শ্রেষ্ঠ বলে উল্লেখ করিয়েছেন। এটা আসলে বিজ্ঞানদর্শনের প্রতি একটা বড় অবিচার। কার্ল পপারের falsifiability নীতির মূল কথাই হলো যে দাবি নতুন প্রমাণ পেলে বদলাতে বা বাতিল হতে পারে, সেটাই বিজ্ঞান; আর যে দাবি কোনো প্রমাণেই কখনো বদলায় না, সেটাকেই বরং সন্দেহের চোখে দেখা উচিত, কারণ সেখানে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের কোনো উপায়ই থাকে না। অর্থাৎ বিজ্ঞানের বদলে যাওয়ার ক্ষমতাটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি, দুর্বলতা নয়। এই প্রসঙ্গে বইয়ে একটা উদাহরণ আছে টলেমির ভূকেন্দ্রিক মডেল নাকি বিজ্ঞান মহলে টিকে ছিল মাত্র ২৫০ বছর। এখানে একটা বড় তথ্যগত ভুল আছে, যেটা যে কেউ দুই মিনিটে গুগল থেকে চেক করে নিতে পারেন। টলেমি তার Almagest গ্রন্থে এই মডেল দাঁড় করান আনুমানিক ১৫০ খ্রিস্টাব্দে, আর নিকোলাস কোপার্নিকাস তার সূর্যকেন্দ্রিক মডেল প্রকাশ করেন ১৫৪৩ সালে। উইকিপিডিয়াতে স্পষ্ট বলা আছে যে ইউরোপে টলেমির এই মডেল ষোড়শ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত প্রায় ১৪০০ বছর ধরে প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ প্রকৃত সংখ্যাটা ২৫০ নয়, প্রায় ১৪০০-১৫০০ বছর। মজার বিষয় হলো, সঠিক সংখ্যাটা আসলে জনাব আরিফ আজাদ সাহেবের নিজের যুক্তিকেই আরও শক্তিশালী করে দিত কারণ তাতে দেখা যেত ভুল ধারণা আরও অনেক বেশি সময় ধরে টিকে ছিল। তাহলে কেন এই ভুল সংখ্যাটা ব্যবহার করা হলো; বুঝলাম না, চেক না করেই লেখা হয়েছে বলে মনে হয়। তাছাড়া টলেমির সময়ে টলেমি এই পৃথিবী কেন্দ্রিক মডেল অনেক অঙ্ক কষে বের করেছিলেন, যেখানে ছিলো ভুল। এছাড়া ধর্মীয় প্রভাবেও তখন ঐ মডেল আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কিছু কিছু জায়গায় নাস্তিক প্রতিপক্ষকে খুবই দুর্বল করে দেখানো হয়েছে। প্রতিপক্ষ তেমন কথাই বলতে পারেনি। বাস্তবে এমন হলে, পুরো বিশ্বে শুধু আস্তিকতাই টিকে থাকতো। এ ছাড়াও "স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করলো" চ্যাপ্টারে জনাব আরিফ আজাদ একপাক্ষিক যুক্তি দিয়ে ডক্টর হুমায়ূন আজাদকে ঘায়েল করেছেন। ইনফিনিটি রিগ্রেশন একটি বিতর্কিত ক্লাসিক্যাল জিনিষ যা বাস্তবে কোনো পক্ষই ১০০% খন্ডন করে পারেনি। কিন্তু জনাব আরিফ আজাদ ঘরের মাঠে একপাক্ষিক যুক্তি দিয়ে জিতে গেছেন ও special pleading ব্যবহার করেছেন। এ নিয়েও লিখবো সামনে... ঋণ স্বীকার: ১)আপনার পিতাই কি আপনার সত্যিকার জন্মদাতা? https://www.shongshoy.com/shongshoy-knowledge-base/about-atheism/%e0%a6%86%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%87-%e0%a6%86%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be/ ২) https://en.wikipedia.org/wiki/Copernican_heliocentrism ৩) https://www.space.com/geocentric-model

0 Comment:

Post a Comment

আপনার যৌক্তিক মতামত লিখুন...